শিশুর অভিভাবকত্ব: একাল-সেকাল

অতসী আমিন

অভিভাবকত্ব – এক কাঁধ নাকি দু’কাঁধের?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ‘শিশু‘ বা ‘শিশুর বেড়ে ওঠা‘ বললেই আপনাআপনি ‘মা‘ শব্দটা মগজে ঘুরপাক খেতে থাকে। অবশ্য শুধু বাংলাদেশেই না, দক্ষিণ এশিয়ার বেশিরভাগ দেশেই শিশুর অভিভাবকত্ব বা প্যারেন্টিং এর ধারণাটি শুধুমাত্র মায়ের দিকে কেন্দ্রীভূত।

ব্র্যাক শিক্ষা উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (ব্র্যাক আইইডি) এবং ফ্রেমওয়ার্কস ইনস্টিটিউট কর্তৃক যৌথভাবে পরিচালিত একটি গবেষণায় দেখা গেছে যে, আমাদের দেশে শিশুর দেখাশোনা করা থেকে শুরু করে যাবতীয় গৃহস্থালি কাজগুলোকে শুধুমাত্র নারী বা মায়েদের কাজ এবং বাইরের কাজগুলো পুরুষ বা বাবাদের কাজ হিসেবে ভাবা হয়। একটা সময় এই জীবনযাত্রা মানিয়ে নেওয়া গেলেও কালের পরিক্রমায় আমাদের আর্থসামাজিক ও পারিবারিক কাঠামো এবং জীবনযাত্রায় অনেকখানি পরিবর্তন এসেছে, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিগত উন্নয়ন হয়েছে। বাবা–মা দু‘জনকে মিলেই পরিবারের অর্থনৈতিক দিকটা সামাল দিতে হচ্ছে। ব্র্যাক আইইডি এবং ফ্রেমওয়ার্কস ইনস্টিটিউট কর্তৃক যৌথভাবে পরিচালিত গবেষণাটিতে আরো উঠে এসেছে যে আমাদের এই সমসাময়িক জীবনযাত্রা – বিশেষত শহুরে জীবন – শিশুদের বেড়ে ওঠা ও বিকাশকে চ্যালেন্জিং করে তুলছে। যেহেতু বাবা–মা দুজনকেই কর্মক্ষেত্রে ছুটতে হচ্ছে, সেহেতু সন্তানের দায়িত্ব আর এক কাঁধের নেই। সময়ের প্রয়োজনে তাই সন্তানের পরিচর্যা ও বিকাশ মূলত ‘টিমওয়ার্ক‘ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই অভিভাবকত্বে এখন বাবা–মা দু‘জনেরই সমান অংশগ্রহণের প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হচ্ছে।

শিশুর বিকাশে অভিভাবকত্ব
আমাদের জীবনযাপনের ধরণে যতই পরিবর্তন আসুক বা যতই ব্যস্ততা বাড়ুক, শিশুদের বড় করে তোলার ক্ষেত্রে বাবা–মায়ের ভূমিকা অপরিসীম। কেননা মা–বাবা বাড়িতে যেভাবে শিশুকে ছোটবেলা থেকে বড় করে তুলবেন, ভবিষ্যতে শিশু সেই ধ্যান–ধারণা আর দৃষ্টিভঙ্গি নিয়েই বড় হবে। কাজেই বাবা–মা দু‘জনকেই বাড়ির পরিবেশটা এমনভাবে তৈরী করতে হবে যা শিশুর সুস্থ শারিরীক ও মানসিক বিকাশকে ত্বরান্বিত করবে।

আমাদের সমাজব্যবস্থায় সন্তানের বেড়ে ওঠায় সাধারণত মায়ের প্রত্যক্ষ ভূমিকা বেশি থাকে এবং বাবারা এক্ষেত্রে অনেকটাই পরোক্ষ ভূমিকা পালন করেন। এখানে দু‘টো বিষয় কাজ করে। প্রথমত, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কারণে এটা ধরেই নেওয়া হয় যে সন্তান লালন–পালন মানেই মায়ের একার দায়–দায়িত্ব। দ্বিতীয়ত, এই ঐতিহ্যগত ও চিরাচরিত ধ্যান–ধারণা থেকে অনেকে বেরিয়ে আসতে চাইলেও অনেক সময় আবার আমরাই এটাকে ‘মেয়েলি‘ কাজ হিসেবে তকমা দিয়ে বসি!

বাস্তবিক অর্থে, মায়ের পাশাপাশি বাবাও যখন শিশুর বেড়ে ওঠায় সমানভাবে অংশগ্রহণ করেন, শিশুর উপর সেটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। আমেরিকান অ্যাকাডেমি অব পিডিয়াট্রিকস প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে বেরিয়ে এসেছে যে শিশুর সার্বিক সুস্থতা, বৃদ্ধি ও বিকাশে বাবার নিয়মিত সঙ্গদানের ব্যাপক প্রভাব রয়েছে। শিশু লালনপালনে বাবারা ‘অতিরিক্ত’ কেউ নন। মায়েরা যা যা দায়িত্ব পালন করেন, বাবাদেরও সেই দায়িত্বগুলো পালন করা জরুরি। এই গবেষণাটিতে আরো উঠে এসেছে যে, সন্তানের সাথে বাবাদের খেলার ধরণও ভিন্ন। শিশুরা বাবাদের কাছ থেকে নতুন কিছু করার, শেখার এবং ঝুঁকি নেবার অনুপ্রেরণা পায়। অপরদিকে, মায়েদের কাছ থেকে তারা স্থিরতা এবং নিরাপত্তা সম্পর্কিত বিষয় শিখতে পারে। শিশুর জীবনে এই দু’টোরই প্রয়োজন রয়েছে। মন্টানা স্টেট বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এক গবেষণা নিবন্ধে বলা হয়েছে যে পরিবারে বাবার সম্পৃক্ততা সন্তানের বিকাশে অনবদ্য ভূমিকা রাখে। বিশেষত সন্তানের বুদ্ধির বিকাশ, নারী–পুরুষ ধারণা তৈরি, মানসিকতা এবং আচরণে বাবার বিশেষ প্রভাব থাকে।

শিশুদের সঙ্গে মা–বাবারা নিয়মিত সময় কাটালে, তাদের মধ্যে হতাশা ও আচরণগত সমস্যা তুলনামূলকভাবে কম দেখা দেয়। সন্তানের আত্মিক বিকাশে তাদের ভূমিকা ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ, আনন্দদায়ক ও একই সাথে চ্যালেঞ্জিংও বটে। বাবা–মায়ের সাথে শিশুর উষ্ণ সম্পর্ক তাকে সফল মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়তা করে। মোটকথা, বাবা–মা দু‘জনের সান্নিধ্যই শিশুদের আত্মবিশ্বাস এবং মনোসামাজিক দক্ষতাকে বাড়িয়ে তোলে।

অভিভাবকত্বের বর্তমান প্রেক্ষাপট: সময় নাকি মানসম্মত সময়?
পূর্বে বাংলাদেশে যৌথ পরিবার ব্যবস্থাই বেশি ছিলো। যেকারণে বাবা–মায়ের পাশাপাশি শিশুর দেখভালের জন্য আরো অনেকেই থাকতো। ধীরে ধীরে পুঁজিবাদী ও প্রতিযোগিতাশীল আর্থসামাজিক কাঠামো যৌথ পরিবারকে ভেঙে একক পরিবারের সংখ্যাকে দিনকে দিন বাড়িয়ে তুলছে। এর ফলে সন্তানের সাথে আগে যেভাবে বাবা–মায়েরা সময় কাটাতে পারতেন, সেভাবে আর সম্ভব হয়ে উঠছে না। প্রায়শই দেখা যায় যে কর্মজীবী বাবা–মা সন্তানের সাথে পুরোটা দিন সময় কাটাতে পারছেন না বলে নিজেদেরকে অপরাধী ভাবছেন! তাই এমন পরিস্থিতিতে, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা শিশুর সাথে ‘কোয়ালিটি টাইম‘ অর্থাৎ মানসম্পন্ন সময় কাটানোর উপর জোর দিচ্ছেন যা সন্তানের সাথে বাবা–মায়ের বন্ধনের উপর ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।

কাজের ভিড়ে যাতে ছোট্ট শিশুটির সাথে বাবা–মায়ের মানসিক দূরত্ব তৈরী না হয়ে যায়, সেজন্য যতটুকু সময় তারা সন্তানের কাছে থাকবেন, ততটুকু সময় তার সাথে মন খুলে গল্প করতে হবে। শিশুটি কি বলতে চায় সেটা আপাতদৃষ্টিতে অর্থহীন মনে হলেও মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে। এতে বাবা–মায়ের উপর শিশুর আস্থা তৈরী হয় ও শিশুর মনে নিরাপত্তার অনুভূতি জন্ম দেয়। গবেষণায় দেখা গেছে যে, শিশুর সাথে একত্রে বসে গল্পের বই পড়া, ছবি আঁকা ও খেলা করা শিশুর প্রারম্ভিক বিকাশের ক্ষেত্রে ভীষণ ফলপ্রসূ।

এখন প্রশ্ন থেকে যায় যে যেসব পরিবারে শুধু বাবা কর্মজীবী, সেক্ষেত্রে কি সব দায়িত্ব মায়ের একার হবে? পুঁজিবাদের বিকাশের পর বাইরের উৎপাদনের বা কাজের জগৎ মুদ্রায়িত (monetized) হলেও গৃহস্থালি বা বাড়ির ভেতরের কাজগুলো কখনোই মুদ্রায়িত হয়নি। বরং অনেকাংশে এটা অবমূল্যায়িত হয়েছে। ফলে এর প্রভাবে আমাদের সমাজব্যবস্থায় নারী ও পুরুষ সম্পর্কিত ধারণা এবং নারী ও পুরুষের ক্ষমতা পরিবর্তিত হয়েছে। তাই আমরা এটা ধরেই নিই যে মা তো গৃহিনী, শিশুর লালন–পালন আর পরিচর্যা তাই শুধু মাকেই করতে হবে!

এই বিষয়ে ব্র্যাক আইইডি ও ফ্রেমওয়ার্কস ইনস্টিটিউট কর্তৃক প্রকাশিত গবেষণাটিতে উঠে এসেছে যে, বর্তমান প্রেক্ষাপটে শিশুকে ভালোভাবে বেড়ে উঠতে সহায়তা করা আসলে পরিবার ও সমাজ সকলেরই দায়িত্ব। অর্থাৎ শিশুকে নিরাপদে ও সুন্দরভাবে বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরী করে দেওয়াটা কারো একক দায়িত্ব না।

পরিবার শিশুর প্রাথমিক এবং সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষাঙ্গন। বাবা–মায়ের কাছ থেকেই শিশুর নৈতিকতা ও মূল্যবোধ এবং জীবনবোধ তৈরী হয়। তাই শিশুর সুস্থ মানসিক ও শারীরিক বিকাশে শুধু বাবা অথবা শুধু মা নয়, বাবা–মা দু‘জনের ভূমিকাই ওতপ্রোতভাবে জড়িত। সারাদিনের কর্মব্যস্ততার পর বাড়িতে ফিরে শিশুকে বুকে জড়িয়ে তার পছন্দের একটা গান বা কবিতা অথবা নিছক একটুকু আদুরে স্পর্শ বাবা–মায়ের সাথে তার সম্পর্ককে করে তুলবে আরো গভীর, উষ্ণ ও প্রাণবন্ত!